হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যুদ্ধের সম্মুখসারির অবস্থান থেকে ওয়াশিংটন ও তেলআবিব দূরে থাকার চেষ্টা করলেও মনে হচ্ছে, এই সংঘাতের নেপথ্যে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। একই সময়ে, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সঙ্গে রিয়াদের জোট ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে সৌদি আরব তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইয়েমেনের কাছে সৌদি আরবের পরাজয়ের পুনরাবৃত্তি নিয়ে আমেরিকা ও ইসরায়েলের পূর্বাভাস
এ বিষয়ে লেবাননের ‘আল-আখবার’ পত্রিকাকে অবহিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নতুন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে সরাসরি উপস্থিত হওয়া এড়িয়ে চললেও তাদের সম্পৃক্ততা অনস্বীকার্য এবং তারা ঘনিষ্ঠভাবে যুদ্ধের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করছে। তবে দুটি কারণে তারা নিজেদের ভূমিকা প্রকাশ্যে আনতে চায় না বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধারণা করছে, এই যুদ্ধে সৌদি আরব পরাজিত হতে পারে। তাই তারা রিয়াদের পরাজয়ের দায় নিজেদের কাঁধে নিতে চায় না এবং আঞ্চলিক ব্যর্থতার তালিকায় আরেকটি পরাজয় যুক্ত করতে চায় না।
ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি যুদ্ধের সঙ্গে আমেরিকান ও ইসরায়েলি সম্পৃক্ততা প্রকাশ্যে স্বীকার করলে তাদের পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তাদের প্রকৃত লক্ষ্যও প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।
বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অক্ষ ও প্রতিরোধ অক্ষের মধ্যকার বৃহত্তর সংঘাতের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। তারা কোনোভাবে এই সংঘাতকে নিজেদের অনুকূলে সমাধানের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তারা জানে, অন্তত বর্তমান পর্যায়ে এ যুদ্ধে বিজয়ের কোনো সুস্পষ্ট সম্ভাবনা তাদের সামনে নেই।
ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদিদের পুরোনো কৌশল এবং নতুন পরাজয়ের পথে যাত্রা
এই বাস্তবতার আলোকে, বর্তমান যুদ্ধের জন্য গড়ে তোলা জোটের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগের যুদ্ধগুলোর তুলনায় এতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নেই।
বর্তমানে আঞ্চলিক এমনকি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো-আগের যুদ্ধের সময় আমেরিকার কৌশলগত বোমারু বিমান, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান এবং ওয়াশিংটনের বিমানবাহী রণতরী ব্যবহার করে সানার বিরুদ্ধে পরিচালিত বহু সরাসরি বিমান হামলা যখন ব্যর্থ হয়েছে, তখন রিয়াদ শুরু করা এই নতুন বিমানযুদ্ধে এমন কী নতুন উপাদান যুক্ত হতে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতি বদলে দেবে?
সৌদি আরব নিজেই আট বছরেরও বেশি সময় ধরে যে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেখানে ইয়েমেনের কাছে পরাজিত হয়েছে। এখন তারা সেই একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি করছে।
এমনকি তুরস্ক ও পাকিস্তান এই যুদ্ধে অংশ নিলেও ‘মক্কা চুক্তি’র বিধান অনুযায়ী তাদের অংশগ্রহণের কাঠামো এমন যে, তা সৌদি আরবের জন্য প্রত্যাশিত সুবিধা বয়ে নাও আনতে পারে।
সৌদি আরব কেন পাকিস্তান ও তুরস্কের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে পারে না?
এখানে মূল যুদ্ধক্ষেত্র হলো ইয়েমেন, সৌদি আরবের ভূখণ্ড নয়। সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আনসারুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা-যেগুলো তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে-সৌদি আরবের ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ ও অবরোধের সরাসরি জবাব।
অতএব, ইয়েমেনের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এমন কোনো আগ্রাসন নেই, যার ভিত্তিতে ‘মক্কা জোট’ সক্রিয় করার যৌক্তিকতা তৈরি হয়। এই জোটের বিধান অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর আগ্রাসনকে অপর দুই সদস্য দেশের ওপরও আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই কারণে ধারণা করা হচ্ছে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের অংশগ্রহণ সম্ভবত সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে; ইয়েমেনের ভূখণ্ডে হামলায় তারা অংশ নেবে না।
তবে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ কোনো হামলায় অংশ নিলেও তারা সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে-যেমন তাদের জাহাজ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং এমনকি তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
মূলত, এ ধরনের অংশগ্রহণ আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ। তুরস্কে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্যও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া একটি গভীর সংকটে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে ২০১৫ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল।
এ ছাড়া, তুরস্ক ও পাকিস্তান যদি পূর্ণাঙ্গভাবে এই যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে প্রতিরোধ অক্ষের সদস্যরা কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে-তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সৌদি জোটে বিভক্তি, বিপরীতে আনসারুল্লাহর ঐক্য ও সংহতি
ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের জোটগুলোর আরেকটি অমীমাংসিত সমস্যা হলো-এই জোটের সদস্যরা বাস্তবে পরস্পরের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ নয়। অনেক সময় তারা যুদ্ধের মাঝপথেই একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে তাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করা কঠিন নয়।
এদিকে সানা সৌদি জোটের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। যেসব গোত্রের সঙ্গে তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, তাদেরও নিজেদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে তারা গোত্রগুলোর মধ্যকার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং তাদের নিজেদের পাশে রাখার কৌশল জানে। বিশেষ করে ইয়েমেনিদের দীর্ঘদিন ধরে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের জন্য প্রস্তুত করে তোলার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলন যে যুদ্ধগুলোতে অংশ নিয়েছে, সেগুলো হয় ইয়েমেনের প্রতিরক্ষার জন্য, অথবা মুসলিম উম্মাহর ন্যায়সংগত দাবিগুলোর পক্ষে-যার শীর্ষে রয়েছে ফিলিস্তিনের ইস্যু।
আনসারুল্লাহর এই অবস্থান তাদের যোদ্ধাদের মনোবল এবং ইয়েমেনি গোত্রগুলোর মধ্যে এই আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ও অবস্থানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং বিপুলসংখ্যক গোত্রকে সানার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে।
অন্যদিকে, সৌদি জোট বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত, যাদের আনুগত্যও ভিন্ন ভিন্ন। লেখাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠী সামান্য রিয়াল বা দিরহামের বিনিময়েও নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে।
এ ছাড়া, সৌদি আরব ‘দক্ষিণ ইয়েমেনের অধিকার’-এর নামে যে বিষয়টি তুলে ধরে ভাড়াটে বাহিনী নিয়োগের চেষ্টা করেছিল, গত কয়েক মাসে দক্ষিণ ইয়েমেনে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে তীব্র সংঘাতের পর সেটিও তার গুরুত্ব ও প্রভাব হারিয়েছে।
একই সময়ে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাড়াটে গোষ্ঠীগুলোও পরস্পরের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনায় লিপ্ত। ফলে এমন একটি বিভক্ত কাঠামো আনসারুল্লাহর মতো সুসংগঠিত শক্তিকে পরাজিত করতে সক্ষম নয়।
অন্যদিকে, জনমতের কাছেও এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সৌদি জোটে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আমেরিকা ও ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করছে। লেখাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বিষয়টিই সৌদি আরবের নতুন যুদ্ধের প্রতি যেকোনো ধরনের জনসমর্থন নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
সবশেষে, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধে সৌদিরা যতই ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে থাকুক না কেন, মাত্র এক দিনই যথেষ্ট হয়েছে-লেখাটির দাবি অনুযায়ী-এটা স্পষ্ট করার জন্য যে এই যুদ্ধ সৌদি আরবকে কোনো কাঙ্ক্ষিত ফলাফলে পৌঁছে দেবে না। এবার ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রিয়াদের পরাজয় হলে তার পরিণতি আগের যুদ্ধের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হতে পারে।
আপনার কমেন্ট